
চ্যানেল বাগেরহাট — অনলাইন নিউজ পোর্টাল
www.channelbagerhat.com
টুঙ্গিপাড়ায় সার্বিয়া পাঠানোর নামে প্রতারণার অভিযোগ: এক বছরেও বিদেশযাত্রা হয়নি ১৫ জনের, খোয়া গেছে প্রায় ৩২ লাখ টাকা
প্রিন্স হালদার, চিতলমারী প্রতিনিধি :

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সার্বিয়া পাঠানোর কথা বলে ১৫ জনের কাছ থেকে প্রায় ৩২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মো. সিদ্দিকুর রহমান নামে এক আদম ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। টাকা দেওয়ার এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত সার্বিয়ায় যেতে পারেননি ভুক্তভোগীরা। উল্টো চারজনকে দেওয়া সার্বিয়ার ভিসা সরকারি যাচাইয়ে জাল প্রমাণিত হওয়ায় তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম হতাশা ও আর্থিক সংকট।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সার্বিয়ায় ভালো বেতনে চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধাপে টাকা নেন সিদ্দিকুর রহমান। প্রত্যেকের কাছ থেকে নেওয়া হয় প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। বিদেশ যাওয়ার আশায় কেউ জমি বিক্রি করেছেন, কেউ মাছের ঘের বন্ধক রেখেছেন, আবার কেউ চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ওই টাকা পরিশোধ করেছেন।
দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর ১৫ জনের মধ্যে চারজনকে সার্বিয়ার ভিসা দেওয়া হয়। তবে ভিসাগুলো নিয়ে সরকারি পর্যায়ে যাচাই করা হলে সেগুলো জাল বলে প্রমাণিত হয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাল শনাক্ত হওয়া ভিসাগুলোর নম্বর হলো— A0894749, A0894762, A0894762 ও A0894764।
ভিসা জাল প্রমাণিত হওয়ার পর ভুক্তভোগীরা তাদের দেওয়া টাকা ফেরত চাইলে বিষয়টি নিয়ে টানাপোড়েন শুরু হয়। টাকা ফেরতের দাবিতে চাপ সৃষ্টি করা হলে মো. সিদ্দিকুর রহমান লিখিতভাবে টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন বলে অভিযোগ করেছেন তারা। এ সময় তিনি গগ ৬৯৯০৮৬২, গগ ৬৯৯০৮৬৩ ও গগ ৬৯৯০৮৬৪ নম্বরের তিনটি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করেন বলেও জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
এছাড়া টাকা ফেরতের নিশ্চয়তা হিসেবে অগ্রণী ব্যাংক, বনানী কর্পোরেট শাখার দুটি তারিখবিহীন চেক দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি তাদের। চেক দুটির নম্বর CDA 4134132 ও CDA 4134154।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিদেশে যাওয়ার আশায় তারা নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে টাকা দিলেও এখন পর্যন্ত বিদেশে যাওয়া তো দূরের কথা, মূল টাকাও ফেরত পাচ্ছেন না। দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করতে করতে অনেকেই ঋণের কিস্তি ও সুদের টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না। ফলে ১৫টি পরিবারের ওপর নেমে এসেছে চরম আর্থিক চাপ।
তাদের আরও অভিযোগ, পাওনা টাকা ফেরত চাইলে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও জীবননাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এতে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও দাবি করেছেন।
ভুক্তভোগীরা জানান, তাদের কাছ থেকে স্বাক্ষরযুক্ত স্ট্যাম্প, ব্যাংকের চেক, ভিসা এবং সরকারি যাচাইসংক্রান্ত বিভিন্ন কাগজপত্র রয়েছে। এসব নথি ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণের পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভিডিও ফুটেজও তাদের কাছে রয়েছে বলে দাবি করেছেন তারা।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পর দীর্ঘদিন ধরে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে। একপর্যায়ে ভিসা দেওয়ার কথা বলে যে কাগজপত্র সরবরাহ করা হয়, তার মধ্য থেকে কয়েকটি সরকারি যাচাইয়ে জাল প্রমাণিত হওয়ায় পুরো বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে সন্দেহ ও ক্ষোভ তৈরি হয়।
তারা অভিযোগ করেন, শুধু মো. সিদ্দিকুর রহমানই নয়, এই প্রতারণার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত থাকলে তাদেরও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায়ের ঘটনা তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে মো. সিদ্দিকুর রহমান ও মো. দবির তালুকদারের বক্তব্য জানতে তাদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া, তাদের কাছ থেকে নেওয়া প্রায় ৩২ লাখ টাকা উদ্ধার এবং দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক।
বিদেশে গিয়ে পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের আশায় ধারদেনা ও সম্পদ বিক্রি করে টাকা দিয়েছিলেন ১৫ জন। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। বরং বিদেশে যেতে না পেরে ঋণের বোঝা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তারা। দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ঘটনার তদন্ত ও প্রতিকার না হলে তাদের আর্থিক ক্ষতি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।



