
চ্যানেল বাগেরহাট — অনলাইন নিউজ পোর্টাল
www.channelbagerhat.com
বাগেরহাটে মারামারি-হট্টগোলের পর শ্রমিক ইউনিয়ন কার্যালয় থেকে পিস্তল উদ্ধার, আটক ৪
বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি:

বাগেরহাট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে মারামারি ও হট্টগোলের পর শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যালয় থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ সময় কক্ষটি থেকে দুজনকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ঘটনা নিয়ে শ্রমিক নেতাদের দুটি গ্রুপের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার রাতে দেড় ঘণ্টার ব্যবধানে দুই পক্ষ বাগেরহাট প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করে।
তবে মঙ্গলবারের ঘটনায় বুধবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি। এদিকে, ঘটনার পর রাতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ আজিম ভূঁইয়াসহ চারজনকে আটক করেছে।
আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মাদক-সংশ্লিষ্টতাসহ দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সূত্র। তাদের ডোপ টেস্ট (মাদক পরীক্ষা) করা হয়েছে। অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বাগেরহাট আন্তজেলা বাস, মিনিবাস, কোচ ও মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কাশেম ভূঁইয়া ওরফে সেলিম ভূঁইয়া অভিযোগ করে বলেন, সন্ত্রাসীরা তাঁর ভাই আজিম ভূঁইয়াকে হত্যার উদ্দেশ্যে অস্ত্র নিয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যালয়ে প্রবেশ করেছিল। তবে তাঁরা তাদের ধরে ফেলেন।
অন্যদিকে, ইউনিয়নের সহসভাপতি খান মোখলেছুর রহমান অভিযোগ করেন, ইউনিয়নের মাসিক সভায় গেলে আজিম ভূঁইয়া ওরফে কানা আজিমের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী তাঁদের ওপর হামলা করে। দুজনকে আটকে রেখে পিটিয়ে ও কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করা হয়। ওই সন্ত্রাসীরা তাঁদের মারতে অস্ত্র বের করেছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বাস টার্মিনালে শ্রমিক ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য নিয়ে ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে শ্রমিক দলের দুটি গ্রুপের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। কয়েক মাস আগে সেখানে ২২ সদস্যের নতুন একটি টার্মিনাল কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি বাসপ্রতি প্রতিদিন ১০ টাকা করে চাঁদা সংগ্রহ করে।
গতকাল মঙ্গলবার টার্মিনাল কমিটি চাঁদা বাবদ সংগ্রহ করা প্রায় ৬৫ হাজার টাকা কমিটির ২২ জনসহ মোট ৪১ জনের মধ্যে ভাগ করে দেয়। এ নিয়ে একটি পক্ষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। এর জেরে গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ‘ইউনিয়ন কার্যালয়ে বিশেষ সভা’ ডাকা হয়। পূর্ববিরোধ ও টার্মিনালের চাঁদার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে মঙ্গলবার রাতে ঘটনার সূত্রপাত হয়। এ সময় প্রতিপক্ষের মারধরে দুজন গুরুতর আহত হন। পরে পুলিশ তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যালয় থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও একটি রাইফেলের গুলি উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার কিছুক্ষণ পর শহরের বিভিন্ন সড়কে ১৫ থেকে ২০টি মোটরসাইকেলে করে অস্ত্রধারী একদল যুবককে চক্কর দিতে দেখা যায়।
আহতরা হলেন শ্রমিক ইউনিয়নের কোষাধ্যক্ষ মেহেদী হাসান ও শহীদ নামে অপর এক শ্রমিক নেতা। তাঁদের বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
চিকিৎসাধীন শহীদ বলেন, “আজিমের ছোট ভাই মাসুক স্ট্যান্ডের পাশে আল-আমিন হোটেলে চার-পাঁচটি কক্ষ নিয়ে কয়েকজন ছেলেপেলে নিয়ে থাকে। সেখানে লোকজনকে ধরে নিয়ে আটকে রাখে, টাকা-পয়সা ছিনতাই করে। বিভিন্ন ধরনের অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। মঙ্গলবার আমার ইট-বালুর গোলার কর্মচারীর ছেলে মিরাজের কাছ থেকে ছয় হাজার টাকা ও মোবাইল নিয়ে যায় এবং তাকে মারধর করে। মিরাজ আমাকে বিষয়টি জানালে আমি শ্রমিক ইউনিয়নে যাই, তার বড় ভাই সেলিম ভূঁইয়াকে বিষয়টি জানাতে।
“সেখানে গিয়ে দেখি, কক্ষে কিছু ছেলেপেলে বসে আছে। আজিম তখন ওই কক্ষের বাইরে ছিল। আমার সঙ্গে ছিনতাইয়ের শিকার মিরাজও ছিল। মাসুক তখন বুঝতে পারে, আমি নালিশ করতে এসেছি। এরই মধ্যে নিচে চিৎকার শুনতে পাই। এরপর ধুম করে দরজা আটকে দেয় এবং গালাগাল ও মারধর শুরু করে। আমাকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে মেহেদীকেও মারধর করে।”
তবে সেলিম ভূঁইয়ার ভাষ্য, মোখলেছ খানরা মূলত আওয়ামী লীগের দোসর। তাঁর তিন ভাই যুবলীগ ও শ্রমিক লীগের সঙ্গে জড়িত। তাই মোখলেছ খানকে টার্মিনাল কমিটিতে রাখা সম্ভব হয়নি। এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তাঁরা অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়ে তাঁর ভাইকে গুলি করে হত্যার উদ্দেশ্যে এসেছিলেন।
সেলিম ভূঁইয়া বলেন, “আমি বাইরে ছিলাম। আমাকে উদ্দেশ্য করেই তারা মারতে এসেছিল। আমাকে না পেয়ে আজিম ভূঁইয়াসহ অন্যদের গুলি করার উদ্দেশ্যে যখন পিস্তল বের করে, তখন তারা সেটি ধরে ফেলে। আমি জানতে পেরে প্রশাসনকে জানাই। পুলিশ আসার আগে তারা পালিয়ে যায়। দুজন অস্ত্রসহ ধরা পড়ে। বিএনপির কিছু লোকের ছত্রচ্ছায়ায় তারা এসব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।”
অন্যদিকে, পাল্টা অভিযোগ করে খান মোখলেছুর রহমান দাবি করেন, সেলিম ভূঁইয়ারা আসলে বিএনপি ও শ্রমিক দলের কেউ নন। তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আজিম ভূঁইয়া স্ট্যান্ডের পাশে একটি হোটেলকে নির্যাতনকেন্দ্র বানিয়েছেন। সেখানে তাঁরা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও চাঁদাবাজি চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
খান মোখলেছুর রহমান বলেন, “মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে শ্রমিক ইউনিয়নের মাসিক সভায় যোগ দিতে আমি ও অন্য নেতাকর্মীরা বাসস্ট্যান্ডে যাই। সেখানে থাকা আজিম ভূঁইয়া ওরফে কানা আজিম এবং তাঁর ভাই সেলিম ভূঁইয়ার নেতৃত্বে একদল লোক আমাদের শ্রমিকদের ওপর অতর্কিত হামলা করে। তাদের কাছে দা, কুড়াল, হকি স্টিক ও দেশীয় অস্ত্র ছিল।
“আমাদের শ্রমিক ইউনিয়নের কোষাধ্যক্ষ মাহাদী হাসান, যিনি চাঁদা সংগ্রহের কাজ করেন, তাঁকে ধরে অফিসের ভেতরে নিয়ে যায়। তাঁকে প্রচণ্ড মারধর করে। মাথা, হাত-পা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে কোপ দেয়। একপর্যায়ে মাহাদী হাসানকে গুলি করতে অস্ত্র বের করে। তবে অনেক শ্রমিক সেখানে চলে আসায় অস্ত্রটি পড়ে যায়। পরে পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা এসে আহতদের উদ্ধার করেন এবং অস্ত্রটি জব্দ করেন।”
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মো. জামিরুল ইসলাম বুধবার বিকেলে বলেন, “মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাগেরহাট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে গণ্ডগোলের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যালয় থেকে আহত অবস্থায় দুজনকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় কক্ষটি থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি বিদেশি পিস্তল ও একটি রাইফেলের গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা অস্ত্রের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে।”



