
চ্যানেল বাগেরহাট — অনলাইন নিউজ পোর্টাল
www.channelbagerhat.com
১৩ বছরেই বিয়ে, যৌতুকের নির্যাতন; ১৯ বছরেই বিচ্ছেদ—রেহানার জীবনে বাল্যবিবাহের গভীর ক্ষত
বাগেরহাট প্রতিনিধি

বাগেরহাটের রেহানা বেগম (ছদ্মনাম)। মাত্র ছয় বছর বয়সে হারিয়েছিলেন বাবাকে। বাবার মৃত্যুর পর মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে মা সেলিনা বেগমের (ছদ্মনাম) সঙ্গে মামাবাড়িতে আশ্রয় নেন তিনি। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ভর্তি হন বিদ্যালয়ে। লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ ও মেধার কারণে শিক্ষকদের নজরেও আসেন। প্রাথমিকের পড়াশোনা কৃতিত্বের সঙ্গে শেষ করে মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন রেহানা। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।
পরিবারের আর্থিক সংকটে বন্ধ হয়ে যায় তার পড়াশোনা। মাত্র ১২ বছর বয়সে পেটের দায়ে কাজের সন্ধানে ঢাকায় পাড়ি জমান রেহানা। বছর না ঘুরতেই তাকে বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে। প্রথমে শিশু রেহানা বিয়েতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বুঝে যান, নিজের জীবনের সিদ্ধান্তে তার মতামতের কোনো গুরুত্ব নেই।
মাত্র ১৩ বছর বয়সেই বিয়ে হয় তার। এরপরই শুরু হয় জীবনের কালো অধ্যায়। বিয়ের পর থেকে প্রায় সাত বছর ধরে বাল্যবিবাহের সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। এখন বিচ্ছেদ হলেও সেই ক্ষত যেন আরও গভীর হয়েছে।
রেহানা বেগম বলেন, “আমার শরীরে এমন এমন দাগ আছে, যা জীবনে আর উঠবে না। যৌতুকের জন্য খুন্তি গরম করে আমার শরীর পুড়িয়ে দিয়েছে। সারা শরীরে মারধরের দাগ। একবার মারধর করে আমার কোমরের হাড় ভেঙে দিয়েছিল। দুই মাস হাসপাতালে থেকে বাড়ি ফিরেছি। এখনো পা খুঁড়িয়ে হাঁটি। একে তো অল্প বয়সে বিয়ে, তার ওপর নির্যাতন—জীবনে এখন পর্যন্ত সুখ মেলেনি।”
তিনি আরও বলেন, “আমার মাত্র ১৩ বছর বয়সেই বিয়ে হয়ে যায়। বিয়েতে আমি রাজি ছিলাম না। বাবা মারা যাওয়ার পর আমার কথা শোনার মতো কেউ ছিল না। পারিবারিক চাপে শেষ পর্যন্ত আমার বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের কয়েক মাস পর থেকেই নির্যাতন শুরু হয়। যৌতুকের চাপ ছিল। টাকা দিতে না পারলেই নির্যাতন করা হতো।”
রেহানা জানান, মামাবাড়িতে বড় হওয়ায় তার পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য ছিল না। স্বামীর পরিবারের চাহিদা পূরণ করতে না পারায় তাকে প্রায়ই নির্যাতনের শিকার হতে হতো। একপর্যায়ে সংসারের খরচ চালাতে তিনি গার্মেন্টসে কাজ শুরু করেন।
তার ভাষ্য, “গার্মেন্টসে কাজ করে যখন বেতন পেতাম, তখন টাকা নেওয়ার জন্য দুই-তিন দিন একটু ভালো ব্যবহার করত। টাকা নেওয়ার পর আবার আগের মতো নির্যাতন করত। জীবনে কোনোদিন স্ত্রীর সম্মান পাইনি। এভাবেই জীবন চলেছে।”
রেহানা আরও বলেন, “টানা তিন বছরে স্বামীর ইচ্ছায় আমার চারটি সন্তান নষ্ট করতে হয়েছে। পরে ১৭ বছর বয়সে আমার একটি ফুটফুটে ছেলে সন্তান হয়। ভেবেছিলাম, এবার হয়তো ছেলের দিকে তাকিয়ে সংসারের প্রতি তার টান আসবে। কিন্তু তা হয়নি; বরং নির্যাতন আরও বেড়ে যায়।”
শেষ পর্যন্ত ১৯ বছর বয়সে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। বর্তমানে স্বামীর শারীরিক নির্যাতন থেকে মুক্ত থাকলেও সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তা ও অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটছে রেহানার।
রেহানার মা সেলিনা বেগম বলেন, “ফাতেমার বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই আমাদের আর্থিক অনটন ছিল। সে বৃত্তি পরীক্ষায় ভালো ফল করেছিল। কিন্তু লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার মতো সামর্থ্য আমাদের ছিল না। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটত। তাই বিয়ের সম্বন্ধ পাওয়ার পর মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিই।”
তিনি বলেন, “মেয়ে মানুষ ঘরে রেখে কী করব—এই চিন্তা থেকেই বিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু স্বামী ভালো না হওয়ায় মেয়ের কপাল পুড়েছে। বর্তমানে অসুস্থ ছেলেসহ আমাদের সঙ্গেই আছে।”
অল্প বয়সে রেহানাকে বিয়ে দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তার মামা হাবিবুর রহমান বলেন, “মেয়ে মানুষ আজ বিয়ে দিলেও দিতে হবে, কাল দিলেও দিতে হবে। বড় হলে বিয়ে দিতে গেলে যৌতুক বেশি লাগে। তাই ঘরে না রেখে বিয়ে দিয়েছিলাম। কপাল খারাপ, তাই সংসার করতে পারেনি।”
সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের বাগেরহাট জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এস কে এ হাসিব বলেন, “সামাজিক নিরাপত্তার অভাব ও আর্থিক অনটনের কারণে অনেক পরিবার মেয়েদের নাবালিকা থাকতেই বিয়ে দিয়ে দেয়। পরিবারের কাছে বাল্যবিয়ে তাৎক্ষণিক সংকট থেকে মুক্তির পথ মনে হলেও বাস্তবে এটি মেয়েদের আরও বেশি সংকটে ফেলে।”
তিনি বলেন, “বাল্যবিয়ের কারণে মেয়েরা শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে এবং নানা ধরনের সহিংসতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ে। একটি পরিবারকে দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের করে আনার পরিবর্তে বাল্যবিয়ে তাদের আরও বেশি দারিদ্র্যের মধ্যে আটকে ফেলে।”
হাসিব আরও বলেন, “বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না। দরিদ্র পরিবারগুলোর সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবারকে সচেতন করতে হবে।”
তিনি জানান, প্রচলিত আইন অনুযায়ী বাল্যবিবাহের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। অভিভাবক, বর-কনে এবং বিয়ে পরিচালনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বাল্যবিবাহকে ক্যান্সারের মতো মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি উল্লেখ করে বাগেরহাট মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক (অঃদাঃ) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ প্রচেষ্টায় আমরা গত এক বছরে ৩৫টি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করেছি। পরবর্তীতেও তাদের খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে।”
তিনি বলেন, “বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে প্রতিনিয়ত উঠান বৈঠকের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। প্রতিটি ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশকেও সচেতন করা হচ্ছে, যাতে তারা নিজ নিজ এলাকার বাল্যবিবাহের বিষয়ে সঠিক তথ্য দিতে পারে এবং সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া যায়।”
রেহানার জীবনের গল্প শুধু একজন নারীর ব্যক্তিগত দুর্ভোগের গল্প নয়; এটি দারিদ্র্য, সামাজিক চাপ, শিক্ষার সুযোগের অভাব, বাল্যবিবাহ ও পারিবারিক সহিংসতার একটি ভয়াবহ চক্রের প্রতিচ্ছবি। শৈশবে যে মেয়েটি মেধা ও স্বপ্ন নিয়ে মাধ্যমিকে পড়ার অপেক্ষায় ছিল, সেই মেয়েকেই মাত্র ১৩ বছর বয়সে সংসারের বোঝা নিতে হয়েছিল। আজ ১৯ বছর বয়সে বিচ্ছেদের পর সন্তানকে নিয়ে নতুন করে বাঁচার লড়াই করছেন তিনি।



